
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবে জ্বালানি খাতে চাপ বাড়ার মধ্যে দেশে যখন সরকার কঠোর নজরদারি জোরদার করেছে, তখন চট্টগ্রামের কর্ণফুলী এলাকায় গড়ে উঠেছে চোরাই জ্বালানি তেলের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট—এমনই অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন কর্ণফুলী উপজেলা আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতা আব্দুর শুক্কুর, যিনি ‘তেল শুক্কুর’ নামে পরিচিত।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিপিসি এবং এর অধীন পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির ডিপো থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম বন্দরে আগত দেশি-বিদেশি জাহাজ—সবখান থেকেই কৌশলে তেল সংগ্রহ করছে এই চক্র।
আইন অনুযায়ী ব্যক্তি পর্যায়ে জ্বালানি তেল আমদানি বা বাজারজাতের সুযোগ না থাকলেও, অভিযোগ রয়েছে—সিন্ডিকেটটি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে তেল সংগ্রহ ও বিক্রি করে যাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বন্দরে নোঙর করা অনেক জাহাজ প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি বহন করে। এই অতিরিক্ত তেল কম দামে গোপনে বিক্রি করা হয় স্থানীয় সিন্ডিকেটের কাছে।
কোনো শুল্ক বা সরকারি প্রক্রিয়া ছাড়াই এসব তেল বাজারে প্রবেশ করায় সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। পাশাপাশি কম দামে বিক্রির কারণে বৈধ বাজার ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সেখানকার স্থানীয়দের দাবি, দুই দশক আগে সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করা আব্দুর শুক্কুর বর্তমানে শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক। কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরে তার বিলাসবহুল বাড়ি ও প্রভাবশালী যোগাযোগ তাকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই শুক্কুরের নেতৃত্বাধীন গ্রুপে অন্তত ১৭ জন চিহ্নিত অপরাধী সক্রিয় রয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে তেল চোরাচালান, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার একাধিক মামলা রয়েছে।
মামলার তালিকা খুঁজতে গিয়ে পিসিআরএ-তে বিভিন্ন থানায় শুক্কুরের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও জিডির তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে চাঁদাবাজি, হামলা, হুমকি ও অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ। এমনকি পারিবারিক বিরোধ নিয়েও থানায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে বলে জানা যায়।
স্থানীয়দের মতে, সিন্ডিকেটটি এতটাই শক্তিশালী যে বৈধ ঠিকাদারদের অনেক ক্ষেত্রেই কাজ করতে দেওয়া হয় না। জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেরাই তেল খালাস ও পরিবহন করে।
পতেঙ্গা এলাকা থেকে শুরু করে বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত এই নেটওয়ার্ক কার্যত একটি সমান্তরাল জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করেছে।
তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন অন্তত ৫০ হাজার লিটার তেল হাতবদল হচ্ছে। জাহাজ থেকে প্রতি লিটার ৫০–৫৫ টাকায় সংগ্রহ করে তা ৬০–৭০ টাকায় বিক্রি করা হয়। এতে প্রতিদিন কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এলাকাবাসী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, এই অবৈধ সিন্ডিকেট দেশের জ্বালানি খাতের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

বিশেষ প্রতিনিধি 
















