০১:৫৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

বরখাস্তের নেপথ্যে পুরোনো বিতর্ক ২০১২ সালের আলোচিত মামলা থেকে বর্তমান বিভাগীয় শাস্তি; আপেল মাহমুদকে ঘিরে নানা প্রশ্ন

  • বিবি কুলসুম
  • প্রকাশের সময় : ০৬:৪০:৪০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • 28

অভিযোগে পুলিশের সাবেক সুপারনিউমারারি অতিরিক্ত ডিআইজি মো. আপেল মাহমুদকে সরকারি চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের শৃঙ্খলা-১ শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। প্রজ্ঞাপনে তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) বিধি অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগে বিভাগীয় মামলা রুজুর সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সাময়িক বরখাস্তকালীন তিনি রাজশাহী রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত থাকবেন এবং বিধি অনুযায়ী খোরপোষ ভাতা পাবেন।

তবে এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সামনে এসেছে তাঁর দীর্ঘ চাকরিজীবনের একটি পুরোনো অধ্যায়। ২০১২ সালের ৮ ডিসেম্বর নাটোরে আলোচিত পলাশ দাশ হত্যা মামলাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন সংসদ সদস্য রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর গ্রেপ্তারের ঘটনাকে ঘিরে আপেল মাহমুদের ভূমিকা নিয়েও পরবর্তীতে নানা অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্য সামনে আসে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় আপেল মাহমুদ সার্কেল পর্যায়ের দায়িত্বে ছিলেন এবং গ্রেপ্তার অভিযানে উপস্থিত ছিলেন। তবে মামলার তদন্ত, গ্রেপ্তার ও রিমান্ড-সংক্রান্ত মূল সিদ্ধান্তগুলো সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছিল—এমন বক্তব্যও তাঁর পক্ষ থেকে উঠে এসেছে। পরবর্তী সময়ে ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপিত হয়।

আপেল মাহমুদের পক্ষের বক্তব্য হলো, তাঁকে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে অভিযোগগুলো সামনে আনা হয়েছিল। তাঁর পক্ষ আরও দাবি করে, প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগগুলোর পক্ষে পর্যাপ্ত প্রত্যক্ষ বা নথিভিত্তিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে এসব দাবির স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ যাচাই এখনো প্রকাশ্য নথিতে স্পষ্ট নয়। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে বিভাগীয় তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

পরবর্তীকালে তাঁর বিরুদ্ধে রিমান্ডে নির্যাতন, অর্থ লেনদেনসহ আরও কিছু অভিযোগ ওঠে বলেও বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য, সরকারি নথি, আর্থিক লেনদেনের তথ্য, কল রেকর্ড কিংবা অন্যান্য নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে সত্যতা যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে।

অন্যদিকে, দীর্ঘ কর্মজীবনে মো. আপেল মাহমুদের পেশাগত দক্ষতা নিয়েও সহকর্মী ও পরিচিত মহলের প্রশংসা রয়েছে। বিশেষ করে কক্সবাজারে ট্যুরিস্ট পুলিশ রিজিয়নে দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। সরকারি নথিতেও ২০২৬ সাল পর্যন্ত তাঁকে ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব পালনের তথ্য পাওয়া যায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন পোস্ট ও মন্তব্যেও সমর্থনের প্রতিফলন দেখা গেছে। কেউ তাঁকে দক্ষ ও কর্মঠ কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন, কেউ তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের সাফল্যের কথা তুলে ধরেছেন। আবার কেউ অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। এসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্য অবশ্য স্বতন্ত্রভাবে যাচাইকৃত প্রমাণ নয়।

একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে যেমন অভিযোগের যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন, তেমনি তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অভিযোগকেই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা না করাও ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির অংশ। একইভাবে কোনো কর্মকর্তার দীর্ঘ চাকরিজীবনের সাফল্যও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের স্বয়ংক্রিয় অব্যাহতি হতে পারে না।

ফলে আপেল মাহমুদকে ঘিরে এখন মূল প্রশ্ন একটাই—অভিযোগগুলোর পেছনে প্রকৃত তথ্য-প্রমাণ কতটা রয়েছে এবং বিভাগীয় তদন্তে তার কতটা প্রতিফলন ঘটে। অভিযোগের সত্যতা, দায় কিংবা নির্দোষিতা—সবকিছুর চূড়ান্ত মূল্যায়ন হওয়া উচিত প্রমাণ, নথি ও বিধিসম্মত তদন্তের ভিত্তিতে।

একজন পুলিশ কর্মকর্তার কর্মজীবনের উজ্জ্বল অধ্যায় কিংবা বিতর্কিত অধ্যায়—কোনোটিই যেন তদন্তের বিকল্প না হয়। কারণ রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের মানদণ্ড শুধু ব্যক্তির জন্য নয়, পুরো প্রতিষ্ঠানটির পেশাগত মনোবল ও জনআস্থার সঙ্গেও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

সিআরএ নির্বাচনে দপ্তর সম্পাদক পদে মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন সাফায়েত মোরশেদ

বরখাস্তের নেপথ্যে পুরোনো বিতর্ক ২০১২ সালের আলোচিত মামলা থেকে বর্তমান বিভাগীয় শাস্তি; আপেল মাহমুদকে ঘিরে নানা প্রশ্ন

প্রকাশের সময় : ০৬:৪০:৪০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অভিযোগে পুলিশের সাবেক সুপারনিউমারারি অতিরিক্ত ডিআইজি মো. আপেল মাহমুদকে সরকারি চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের শৃঙ্খলা-১ শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। প্রজ্ঞাপনে তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) বিধি অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগে বিভাগীয় মামলা রুজুর সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সাময়িক বরখাস্তকালীন তিনি রাজশাহী রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত থাকবেন এবং বিধি অনুযায়ী খোরপোষ ভাতা পাবেন।

তবে এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সামনে এসেছে তাঁর দীর্ঘ চাকরিজীবনের একটি পুরোনো অধ্যায়। ২০১২ সালের ৮ ডিসেম্বর নাটোরে আলোচিত পলাশ দাশ হত্যা মামলাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন সংসদ সদস্য রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর গ্রেপ্তারের ঘটনাকে ঘিরে আপেল মাহমুদের ভূমিকা নিয়েও পরবর্তীতে নানা অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্য সামনে আসে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় আপেল মাহমুদ সার্কেল পর্যায়ের দায়িত্বে ছিলেন এবং গ্রেপ্তার অভিযানে উপস্থিত ছিলেন। তবে মামলার তদন্ত, গ্রেপ্তার ও রিমান্ড-সংক্রান্ত মূল সিদ্ধান্তগুলো সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছিল—এমন বক্তব্যও তাঁর পক্ষ থেকে উঠে এসেছে। পরবর্তী সময়ে ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপিত হয়।

আপেল মাহমুদের পক্ষের বক্তব্য হলো, তাঁকে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে অভিযোগগুলো সামনে আনা হয়েছিল। তাঁর পক্ষ আরও দাবি করে, প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগগুলোর পক্ষে পর্যাপ্ত প্রত্যক্ষ বা নথিভিত্তিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে এসব দাবির স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ যাচাই এখনো প্রকাশ্য নথিতে স্পষ্ট নয়। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে বিভাগীয় তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

পরবর্তীকালে তাঁর বিরুদ্ধে রিমান্ডে নির্যাতন, অর্থ লেনদেনসহ আরও কিছু অভিযোগ ওঠে বলেও বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য, সরকারি নথি, আর্থিক লেনদেনের তথ্য, কল রেকর্ড কিংবা অন্যান্য নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে সত্যতা যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে।

অন্যদিকে, দীর্ঘ কর্মজীবনে মো. আপেল মাহমুদের পেশাগত দক্ষতা নিয়েও সহকর্মী ও পরিচিত মহলের প্রশংসা রয়েছে। বিশেষ করে কক্সবাজারে ট্যুরিস্ট পুলিশ রিজিয়নে দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। সরকারি নথিতেও ২০২৬ সাল পর্যন্ত তাঁকে ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব পালনের তথ্য পাওয়া যায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন পোস্ট ও মন্তব্যেও সমর্থনের প্রতিফলন দেখা গেছে। কেউ তাঁকে দক্ষ ও কর্মঠ কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন, কেউ তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের সাফল্যের কথা তুলে ধরেছেন। আবার কেউ অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। এসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্য অবশ্য স্বতন্ত্রভাবে যাচাইকৃত প্রমাণ নয়।

একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে যেমন অভিযোগের যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন, তেমনি তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অভিযোগকেই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা না করাও ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির অংশ। একইভাবে কোনো কর্মকর্তার দীর্ঘ চাকরিজীবনের সাফল্যও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের স্বয়ংক্রিয় অব্যাহতি হতে পারে না।

ফলে আপেল মাহমুদকে ঘিরে এখন মূল প্রশ্ন একটাই—অভিযোগগুলোর পেছনে প্রকৃত তথ্য-প্রমাণ কতটা রয়েছে এবং বিভাগীয় তদন্তে তার কতটা প্রতিফলন ঘটে। অভিযোগের সত্যতা, দায় কিংবা নির্দোষিতা—সবকিছুর চূড়ান্ত মূল্যায়ন হওয়া উচিত প্রমাণ, নথি ও বিধিসম্মত তদন্তের ভিত্তিতে।

একজন পুলিশ কর্মকর্তার কর্মজীবনের উজ্জ্বল অধ্যায় কিংবা বিতর্কিত অধ্যায়—কোনোটিই যেন তদন্তের বিকল্প না হয়। কারণ রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের মানদণ্ড শুধু ব্যক্তির জন্য নয়, পুরো প্রতিষ্ঠানটির পেশাগত মনোবল ও জনআস্থার সঙ্গেও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।