০৬:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬

জঙ্গল সলিমপুরে র‍্যাব কর্মকর্তাকে হত্যা প্রধান আসামি ইয়াসিনকে গ্রেফতার, ব্যর্থ প্রশাসন

  • প্রকাশের সময় : ১২:৩৬:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬
  • 0

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল ছলিমপুর নামটি এখন আর শুধু একটি পাহাড়ি জনপদের পরিচয় নয়। এটি দীর্ঘদিনের দখলদারিত্ব, পাহাড় কাটা, অবৈধ জমি বাণিজ্য, সন্ত্রাস এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার এক জীবন্ত প্রতীক। যে জায়গাটিকে প্রশাসন বহু বছর ধরে “ঝুঁকিপূর্ণ” বলে চিহ্নিত করলেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, সেই জায়গাতেই গড়ে উঠেছিল একটি সমান্তরাল শাসন কাঠামো। রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো যেখানে দুর্বল, সেখানে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নির্দেশই হয়ে উঠেছিল অলিখিত আইন। আর সেই অলিখিত আইনের সবচেয়ে আলোচিত নোয়াখালী থেকে ছুটে আসা, নাম মোহাম্মদ ইয়াছিন।

স্থানীয়দের মুখে তিনি জঙ্গল সলিমপুরের‘আলীনগরের রাজা’। অভিযানের বহুদিন পার হয়ে গেলেও তিনি অধরা। প্রশাসন বলছে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে, কিন্তু মাঠের বাস্তবতায় স্থানীয়রা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের ভাষায়, বাহিনী এলেও ভয় যায়নি, কারণ নিয়ন্ত্রণের অদৃশ্য কেন্দ্রটি এখনো অক্ষত।

এই অদৃশ্য ক্ষমতার গল্প কেবল আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়, এটি শহরায়ণের চাপ, আশ্রয়হীন মানুষের ঢল, ভূমিদস্যুতা, রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ন্ত্রিত বসতি এবং পরিবেশ ধ্বংসের মিলিত পরিণতি। স্থানীয়রা বলছেন, ২০০২ থেকে ২০০৩ সালের দিকে প্রথম পাহাড় কেটে বসতি গড়ার কাজ শুরু হয়। কাজের খোঁজে চট্টগ্রামে আসা ছিন্নমূল মানুষের জন্য পাহাড়ি এই অঞ্চল হয়ে ওঠে আশ্রয়। প্রথমে ছিল অস্থায়ী ঘর। পরে পাহাড় কেটে ছোট ছোট প্লট তৈরি হয়। তারপর সেই প্লট বিক্রি শুরু হয়। বৈধ দলিল ছাড়া, রেজিস্ট্রি ছাড়া, সরকারি নথি ছাড়া, শুধু ভয় আর নিয়ন্ত্রণের জোরে একেকটি প্লট “বিক্রি” হতে থাকে। ধীরে ধীরে একটি বিশাল জনপদ দাঁড়িয়ে যায়। স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, এই এলাকাটি প্রায় ৩১০০ একর সরকারি খাস জমি। বহু পাহাড় কেটে, বহু ঢাল সমান করে, বহু বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত করে, গড়ে ওঠে এমন এক বসতি, যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি ছিল সীমিত, কিন্তু দখলদারদের উপস্থিতি ছিল সর্বগ্রাসী।

এই দখলদার নেটওয়ার্কের নেতৃত্বে উঠে আসেন মোহাম্মদ ইয়াছিন। স্থানীয় বর্ণনায় তিনি একসময় দিনমজুর হিসেবে কাজ করেছেন। পরে পাহাড় কাটা, মাটি সরবরাহ, প্লট ভাগ করা, জমি দেখানো, সন্ত্রাসী রাজত্ব,দখল নিশ্চিত করা এবং বিরোধ মেটানোর “সালিশি ক্ষমতা” নিজের হাতে নিতে নিতে তিনি এক পর্যায়ে আলীনগরের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রকে পরিণত হন। স্থানীয়দের দাবি, আলীনগরে তার অনুমতি ছাড়া কেউ জমি কিনতে পারত না। কেউ ঘর তুলতে পারত না। কেউ নতুন করে থাকতে পারত না। এমনকি কে এলাকায় ঢুকবে, কে বের হবে, সেই নিয়ন্ত্রণও ছিল একটি নির্দিষ্ট নেটওয়ার্কের হাতে।

স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে ‘আলী নগর বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের একটি কাঠামোর কথা। কাগজে কলমে এটি সমবায় হতে পারে, কিন্তু এলাকাবাসীর মতে বাস্তবে এটি ছিল নিয়ন্ত্রণের সাংগঠনিক মুখোশ। তারা বলেন, এই সমিতির কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন ইয়াছিনের ছোট ভাই মোহাম্মদ ওমর ফারুক এবং তার ভাগ্নে আনোয়ার। সহযোগীদের মধ্যে ছিল নূরুল হক ভান্ডারী, মোর্শেদ, কালা ফারুক, মেহেদী হাসানসহ আরও কয়েকজন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গল ছলিমপুরকে ১১টি ‘সমাজে’ ভাগ করা হয়। প্রতিটি সমাজে কিছু স্থানীয় নেতৃত্ব থাকলেও আলীনগরের নিয়ন্ত্রণ এককভাবে ইয়াছিনের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।

এই নিয়ন্ত্রণ শুধু কথার নয়, অবকাঠামোর মাধ্যমেও দৃশ্যমান ছিল বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, একসময় এলাকায় একটি বড় লোহার গেট ছিল। গেটের ভেতরে প্রবেশ করতে হলে অনুমতি লাগত। বহিরাগতদের প্রবেশ ছিল নিয়ন্ত্রিত। এলাকাটিতে নিজস্ব নিরাপত্তা কর্মীও ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। যৌথবাহিনীর অভিযানের সময় সেই গেট ভেঙে ফেলা হয়। কিন্তু গেট ভেঙে গেলেও ভয় ভাঙেনি। কারণ ক্ষমতার কাঠামো কেবল গেটে নয়, মানুষের মনে বসবাস করে। স্থানীয়দের একজন দোকানি বলেন, সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললেও খবর দ্রুত ইয়াছিন পর্যন্ত পৌঁছে যায়। অর্থাৎ ইয়াছিন সেখানে উপস্থিত না থাকলেও তার “তথ্য নেটওয়ার্ক” কাজ করে বলে মানুষের বিশ্বাস।

এই ভয় এবং নিয়ন্ত্রণের পরিণতি সবচেয়ে ভয়াবহভাবে সামনে আসে ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি। সেদিন বিকেলে র‌্যাবের একটি দল কয়েকটি মাইক্রোবাসে করে জঙ্গল ছলিমপুর এলাকায় অভিযানে যায়। মামলা ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, এলাকায় মাইকে ঘোষণা দিয়ে লোকজনকে জড়ো করা হয়। উত্তেজনা ছড়ায়। তারপর র‌্যাব সদস্যদের ঘিরে ফেলে হামলা করা হয়। সেই হামলায় নিহত হন র‌্যাবের উপসহকারী পরিচালক নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। একটি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্যকে এভাবে প্রকাশ্যে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। এই ঘটনার পর প্রশাসন কঠোর অবস্থান নেয়। সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশের প্রায় চার হাজার সদস্য নিয়ে যৌথ অভিযান চালানো হয়। দীর্ঘদিন পর প্রথমবারের মতো ব্যাপক তল্লাশি হয়। অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধারের দাবি আসে। বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, মূল নেতৃত্ব আগেই সরে যেতে পেরেছে।

অভিযানের পর প্রশাসনের বক্তব্য ছিল, এখন জঙ্গল ছলিমপুরে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, অভিযান সফল এবং পরিস্থিতি স্থিতিশীল। র‌্যাব কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এলাকায় যৌথবাহিনীর দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প রয়েছে এবং সেখানে এক লাখের মতো মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রশাসন উন্নয়ন পরিকল্পনার কথাও বলেছে। চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার জিয়া উদ্দিনের বক্তব্য অনুযায়ী, সলিমপুরে অবকাঠামো উন্নয়নের প্রস্তাব হয়েছে, জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, সুপারিশ পেলে প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হবে, পুলিশ ও এপিবিএনের স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগও আছে। অর্থাৎ প্রশাসনের ভাষ্যে এটি এখন “পুনর্গঠন ও নিয়ন্ত্রণ” এর পথে।

কিন্তু স্থানীয়দের বক্তব্যে একটি বড় ফারাক। তারা বলছেন, অভিযান মানেই নিয়ন্ত্রণ নয়। অভিযান শেষে বাহিনী কতদিন থাকবে, সেটাই তাদের বড় প্রশ্ন। তাদের আশঙ্কা, বাহিনী সরে গেলেই পুরোনো কাঠামো আবার ফিরে আসবে। অতীতেও এমন হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। অভিযানের পর যারা আটক হয়েছে, তাদেরকে “বড় কেউ না” বলে অভিহিত করছেন অনেকে। আর সবচেয়ে বড় কথা, অভিযানের এক মাস পরও প্রধান আসামি মোহাম্মদ ইয়াছিন অধরা থাকায় তারা মনে করছেন, ইয়াছিনের ক্ষমতা ভাঙেনি। বরং তিনি আড়াল থেকেই পরিস্থিতি দেখছেন, এমন ধারণাও কারও কারও।

এই ঘটনার পর সীতাকুণ্ড থানায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলায় মোট ২৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি মোহাম্মদ ইয়াছিন। অন্যান্য আসামিরা হলেন নূরুল হক ভান্ডারি, কালা ইয়াছিন ওরফে জামাই ইয়াছিন, মোঃ শাহেদ আলী, মেজবাহ, মোঃ হাছান, মামুন ওরফে বেদ্য মামুন, মোঃ শাহিন, খলিলুর রহমান, মোহাম্মদ ওমর ফারুক, ইউনুস আলী হাওলাদার, মোঃ মোরশেদ, মোঃ নূর হোসেন, কাজী ফারুক ওরফে কালা ফারুক, সালাউদ্দিন, মোঃ মিজান, মোহাম্মদ শাহিন, মোঃ শুকুর, আলা বাচ্চু, মোঃ ফয়সাল, সাগর, আলম, বেলাল, সাইফুল, সুলতান, জাহিদ, মোঃ নাহিদ ইসলাম, মোঃ শাহ আলম ওরফে টুটুল এবং মোঃ পারভেজ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদ ইয়াছিনের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, অপহরণসহ ২২টিরও বেশি মামলা থাকার কথা বলা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ের অভিযোগ আরও কঠিন। কেউ কেউ বলছেন, প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে ইয়াছিনের সম্পর্ক থাকার কারণেই তাকে এতদিন গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। এই অভিযোগ প্রমাণিত কি না, সেটি তদন্তসাপেক্ষ। কিন্তু অভিযোগটি স্থানীয় সমাজে বহুল প্রচারিত হওয়ায় মানুষের আস্থার জায়গায় বড় ফাটল তৈরি হয়েছে। কারণ সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, এত বড় একটি অবৈধ বসতি, এত বড় জমি বাণিজ্য, এত বড় পাহাড় কাটা, এত বড় সন্ত্রাসী কাঠামো কীভাবে বছরের পর বছর টিকে থাকে, যদি রাষ্ট্র সত্যিই কঠোর থাকে।

জঙ্গল ছলিমপুরের অর্থনীতি নিয়েও স্থানীয়দের বক্তব্য বিস্ফোরক। তারা বলছেন, জমি বিক্রি, পাহাড় কাটা, মাটি বিক্রি, ঘর নির্মাণ, বিদ্যুৎ সংযোগ, পানি সরবরাহ, দোকান বাজার নিয়ন্ত্রণ, এসব খাতে বিপুল অর্থ লেনদেন হতো। একটি প্লটের দাম সময়ের সঙ্গে বেড়েছে। চাহিদা বেড়েছে। সেই চাহিদার কেন্দ্রেই ছিল নিয়ন্ত্রণ। বিদ্যুৎ সংযোগের ক্ষেত্রেও অবৈধ লাইনের অভিযোগ এসেছে, মাসিক চাঁদার অভিযোগ এসেছে, দোকান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ফি আদায়ের অভিযোগ এসেছে। এই অভিযোগগুলো সত্য হলে এটি শুধু একটি অপরাধ চক্র নয়, এটি একটি সমান্তরাল রাজস্ব ব্যবস্থা, যেখানে রাষ্ট্রের করব্যবস্থা নয়, একটি গোষ্ঠীর চাঁদাব্যবস্থাই ছিল কার্যকর।

তবে জঙ্গল ছলিমপুরের বাস্তবতা শুধু অপরাধের কাহিনি নয়, এটি বসবাসকারী মানুষের জটিল গল্পও। অনেকেই এখানে এসেছে স্বল্প খরচে বসতির আশায়। শহরের ভাড়া, জমির দাম, পরিকল্পিত আবাসনের সীমাবদ্ধতার কারণে তারা এই অনিশ্চিত ব্যবস্থার মধ্যেও আশ্রয় খুঁজেছে। কেউ কেউ বলছেন, অন্য কোথাও ঘর তোলার সামর্থ্য ছিল না, তাই তারা বাধ্য হয়েছে। এই বাধ্যতার সুযোগ নিয়েই গড়ে ওঠে দখলদার সিন্ডিকেট। ফলে এখানে একদিকে অপরাধ অর্থনীতি, অন্যদিকে বাস্তুচ্যুত মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই, দুটিই একই জায়গায় জড়ো হয়েছে।

এখানেই প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু অভিযান চালিয়ে অস্থায়ীভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলে, সমস্যার শেকড় থেকে যায়। আবার শুধু উচ্ছেদ করলে তৈরি হয় মানবিক সংকট। তাই স্থানীয়দের মতে, প্রকৃত পরিবর্তন আসবে তখনই, যখন অবৈধ দখল ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভাঙার পাশাপাশি বাস্তবসম্মত পুনর্বাসন, পরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশ রক্ষা এবং আইন প্রয়োগ একসঙ্গে চলবে। নইলে জঙ্গল ছলিমপুর কেবল নাম বদলাবে, কিন্তু কাঠামো বদলাবে না।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, অভিযানের বহুদিন পরও প্রধান আসামি মোহাম্মদ ইয়াছিন অধরা কেন। প্রশাসনের দাবি, তাকে ধরতে চেষ্টা অব্যাহত। স্থানীয়দের দাবি, তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি কাঠামোর প্রতীক। তাই তাকে গ্রেপ্তার করা মানে একটি নেটওয়ার্ককে ভাঙা। আর এই ভাঙার লড়াইয়ে রাষ্ট্র কতটা ধারাবাহিক, সেটাই এখন দেখার বিষয়। কারণ জঙ্গল ছলিমপুরের ভয় কেবল অস্ত্রে নয়, এটি একটি দীর্ঘদিনের “অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ” এর মনস্তত্ত্ব। সেই মনস্তত্ত্ব ভাঙতে হলে, শুধু একদিনের অভিযান নয়, দরকার দীর্ঘদিনের আইনি, প্রশাসনিক এবং সামাজিক পুনর্গঠন।

জনপ্রিয়

জঙ্গল সলিমপুরে র‍্যাব কর্মকর্তাকে হত্যা প্রধান আসামি ইয়াসিনকে গ্রেফতার, ব্যর্থ প্রশাসন

জঙ্গল সলিমপুরে র‍্যাব কর্মকর্তাকে হত্যা প্রধান আসামি ইয়াসিনকে গ্রেফতার, ব্যর্থ প্রশাসন

প্রকাশের সময় : ১২:৩৬:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল ছলিমপুর নামটি এখন আর শুধু একটি পাহাড়ি জনপদের পরিচয় নয়। এটি দীর্ঘদিনের দখলদারিত্ব, পাহাড় কাটা, অবৈধ জমি বাণিজ্য, সন্ত্রাস এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার এক জীবন্ত প্রতীক। যে জায়গাটিকে প্রশাসন বহু বছর ধরে “ঝুঁকিপূর্ণ” বলে চিহ্নিত করলেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, সেই জায়গাতেই গড়ে উঠেছিল একটি সমান্তরাল শাসন কাঠামো। রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো যেখানে দুর্বল, সেখানে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নির্দেশই হয়ে উঠেছিল অলিখিত আইন। আর সেই অলিখিত আইনের সবচেয়ে আলোচিত নোয়াখালী থেকে ছুটে আসা, নাম মোহাম্মদ ইয়াছিন।

স্থানীয়দের মুখে তিনি জঙ্গল সলিমপুরের‘আলীনগরের রাজা’। অভিযানের বহুদিন পার হয়ে গেলেও তিনি অধরা। প্রশাসন বলছে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে, কিন্তু মাঠের বাস্তবতায় স্থানীয়রা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের ভাষায়, বাহিনী এলেও ভয় যায়নি, কারণ নিয়ন্ত্রণের অদৃশ্য কেন্দ্রটি এখনো অক্ষত।

এই অদৃশ্য ক্ষমতার গল্প কেবল আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়, এটি শহরায়ণের চাপ, আশ্রয়হীন মানুষের ঢল, ভূমিদস্যুতা, রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ন্ত্রিত বসতি এবং পরিবেশ ধ্বংসের মিলিত পরিণতি। স্থানীয়রা বলছেন, ২০০২ থেকে ২০০৩ সালের দিকে প্রথম পাহাড় কেটে বসতি গড়ার কাজ শুরু হয়। কাজের খোঁজে চট্টগ্রামে আসা ছিন্নমূল মানুষের জন্য পাহাড়ি এই অঞ্চল হয়ে ওঠে আশ্রয়। প্রথমে ছিল অস্থায়ী ঘর। পরে পাহাড় কেটে ছোট ছোট প্লট তৈরি হয়। তারপর সেই প্লট বিক্রি শুরু হয়। বৈধ দলিল ছাড়া, রেজিস্ট্রি ছাড়া, সরকারি নথি ছাড়া, শুধু ভয় আর নিয়ন্ত্রণের জোরে একেকটি প্লট “বিক্রি” হতে থাকে। ধীরে ধীরে একটি বিশাল জনপদ দাঁড়িয়ে যায়। স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, এই এলাকাটি প্রায় ৩১০০ একর সরকারি খাস জমি। বহু পাহাড় কেটে, বহু ঢাল সমান করে, বহু বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত করে, গড়ে ওঠে এমন এক বসতি, যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি ছিল সীমিত, কিন্তু দখলদারদের উপস্থিতি ছিল সর্বগ্রাসী।

এই দখলদার নেটওয়ার্কের নেতৃত্বে উঠে আসেন মোহাম্মদ ইয়াছিন। স্থানীয় বর্ণনায় তিনি একসময় দিনমজুর হিসেবে কাজ করেছেন। পরে পাহাড় কাটা, মাটি সরবরাহ, প্লট ভাগ করা, জমি দেখানো, সন্ত্রাসী রাজত্ব,দখল নিশ্চিত করা এবং বিরোধ মেটানোর “সালিশি ক্ষমতা” নিজের হাতে নিতে নিতে তিনি এক পর্যায়ে আলীনগরের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রকে পরিণত হন। স্থানীয়দের দাবি, আলীনগরে তার অনুমতি ছাড়া কেউ জমি কিনতে পারত না। কেউ ঘর তুলতে পারত না। কেউ নতুন করে থাকতে পারত না। এমনকি কে এলাকায় ঢুকবে, কে বের হবে, সেই নিয়ন্ত্রণও ছিল একটি নির্দিষ্ট নেটওয়ার্কের হাতে।

স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে ‘আলী নগর বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের একটি কাঠামোর কথা। কাগজে কলমে এটি সমবায় হতে পারে, কিন্তু এলাকাবাসীর মতে বাস্তবে এটি ছিল নিয়ন্ত্রণের সাংগঠনিক মুখোশ। তারা বলেন, এই সমিতির কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন ইয়াছিনের ছোট ভাই মোহাম্মদ ওমর ফারুক এবং তার ভাগ্নে আনোয়ার। সহযোগীদের মধ্যে ছিল নূরুল হক ভান্ডারী, মোর্শেদ, কালা ফারুক, মেহেদী হাসানসহ আরও কয়েকজন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গল ছলিমপুরকে ১১টি ‘সমাজে’ ভাগ করা হয়। প্রতিটি সমাজে কিছু স্থানীয় নেতৃত্ব থাকলেও আলীনগরের নিয়ন্ত্রণ এককভাবে ইয়াছিনের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।

এই নিয়ন্ত্রণ শুধু কথার নয়, অবকাঠামোর মাধ্যমেও দৃশ্যমান ছিল বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, একসময় এলাকায় একটি বড় লোহার গেট ছিল। গেটের ভেতরে প্রবেশ করতে হলে অনুমতি লাগত। বহিরাগতদের প্রবেশ ছিল নিয়ন্ত্রিত। এলাকাটিতে নিজস্ব নিরাপত্তা কর্মীও ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। যৌথবাহিনীর অভিযানের সময় সেই গেট ভেঙে ফেলা হয়। কিন্তু গেট ভেঙে গেলেও ভয় ভাঙেনি। কারণ ক্ষমতার কাঠামো কেবল গেটে নয়, মানুষের মনে বসবাস করে। স্থানীয়দের একজন দোকানি বলেন, সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললেও খবর দ্রুত ইয়াছিন পর্যন্ত পৌঁছে যায়। অর্থাৎ ইয়াছিন সেখানে উপস্থিত না থাকলেও তার “তথ্য নেটওয়ার্ক” কাজ করে বলে মানুষের বিশ্বাস।

এই ভয় এবং নিয়ন্ত্রণের পরিণতি সবচেয়ে ভয়াবহভাবে সামনে আসে ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি। সেদিন বিকেলে র‌্যাবের একটি দল কয়েকটি মাইক্রোবাসে করে জঙ্গল ছলিমপুর এলাকায় অভিযানে যায়। মামলা ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, এলাকায় মাইকে ঘোষণা দিয়ে লোকজনকে জড়ো করা হয়। উত্তেজনা ছড়ায়। তারপর র‌্যাব সদস্যদের ঘিরে ফেলে হামলা করা হয়। সেই হামলায় নিহত হন র‌্যাবের উপসহকারী পরিচালক নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। একটি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্যকে এভাবে প্রকাশ্যে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। এই ঘটনার পর প্রশাসন কঠোর অবস্থান নেয়। সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশের প্রায় চার হাজার সদস্য নিয়ে যৌথ অভিযান চালানো হয়। দীর্ঘদিন পর প্রথমবারের মতো ব্যাপক তল্লাশি হয়। অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধারের দাবি আসে। বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, মূল নেতৃত্ব আগেই সরে যেতে পেরেছে।

অভিযানের পর প্রশাসনের বক্তব্য ছিল, এখন জঙ্গল ছলিমপুরে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, অভিযান সফল এবং পরিস্থিতি স্থিতিশীল। র‌্যাব কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এলাকায় যৌথবাহিনীর দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প রয়েছে এবং সেখানে এক লাখের মতো মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রশাসন উন্নয়ন পরিকল্পনার কথাও বলেছে। চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার জিয়া উদ্দিনের বক্তব্য অনুযায়ী, সলিমপুরে অবকাঠামো উন্নয়নের প্রস্তাব হয়েছে, জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, সুপারিশ পেলে প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হবে, পুলিশ ও এপিবিএনের স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগও আছে। অর্থাৎ প্রশাসনের ভাষ্যে এটি এখন “পুনর্গঠন ও নিয়ন্ত্রণ” এর পথে।

কিন্তু স্থানীয়দের বক্তব্যে একটি বড় ফারাক। তারা বলছেন, অভিযান মানেই নিয়ন্ত্রণ নয়। অভিযান শেষে বাহিনী কতদিন থাকবে, সেটাই তাদের বড় প্রশ্ন। তাদের আশঙ্কা, বাহিনী সরে গেলেই পুরোনো কাঠামো আবার ফিরে আসবে। অতীতেও এমন হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। অভিযানের পর যারা আটক হয়েছে, তাদেরকে “বড় কেউ না” বলে অভিহিত করছেন অনেকে। আর সবচেয়ে বড় কথা, অভিযানের এক মাস পরও প্রধান আসামি মোহাম্মদ ইয়াছিন অধরা থাকায় তারা মনে করছেন, ইয়াছিনের ক্ষমতা ভাঙেনি। বরং তিনি আড়াল থেকেই পরিস্থিতি দেখছেন, এমন ধারণাও কারও কারও।

এই ঘটনার পর সীতাকুণ্ড থানায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলায় মোট ২৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি মোহাম্মদ ইয়াছিন। অন্যান্য আসামিরা হলেন নূরুল হক ভান্ডারি, কালা ইয়াছিন ওরফে জামাই ইয়াছিন, মোঃ শাহেদ আলী, মেজবাহ, মোঃ হাছান, মামুন ওরফে বেদ্য মামুন, মোঃ শাহিন, খলিলুর রহমান, মোহাম্মদ ওমর ফারুক, ইউনুস আলী হাওলাদার, মোঃ মোরশেদ, মোঃ নূর হোসেন, কাজী ফারুক ওরফে কালা ফারুক, সালাউদ্দিন, মোঃ মিজান, মোহাম্মদ শাহিন, মোঃ শুকুর, আলা বাচ্চু, মোঃ ফয়সাল, সাগর, আলম, বেলাল, সাইফুল, সুলতান, জাহিদ, মোঃ নাহিদ ইসলাম, মোঃ শাহ আলম ওরফে টুটুল এবং মোঃ পারভেজ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদ ইয়াছিনের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, অপহরণসহ ২২টিরও বেশি মামলা থাকার কথা বলা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ের অভিযোগ আরও কঠিন। কেউ কেউ বলছেন, প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে ইয়াছিনের সম্পর্ক থাকার কারণেই তাকে এতদিন গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। এই অভিযোগ প্রমাণিত কি না, সেটি তদন্তসাপেক্ষ। কিন্তু অভিযোগটি স্থানীয় সমাজে বহুল প্রচারিত হওয়ায় মানুষের আস্থার জায়গায় বড় ফাটল তৈরি হয়েছে। কারণ সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, এত বড় একটি অবৈধ বসতি, এত বড় জমি বাণিজ্য, এত বড় পাহাড় কাটা, এত বড় সন্ত্রাসী কাঠামো কীভাবে বছরের পর বছর টিকে থাকে, যদি রাষ্ট্র সত্যিই কঠোর থাকে।

জঙ্গল ছলিমপুরের অর্থনীতি নিয়েও স্থানীয়দের বক্তব্য বিস্ফোরক। তারা বলছেন, জমি বিক্রি, পাহাড় কাটা, মাটি বিক্রি, ঘর নির্মাণ, বিদ্যুৎ সংযোগ, পানি সরবরাহ, দোকান বাজার নিয়ন্ত্রণ, এসব খাতে বিপুল অর্থ লেনদেন হতো। একটি প্লটের দাম সময়ের সঙ্গে বেড়েছে। চাহিদা বেড়েছে। সেই চাহিদার কেন্দ্রেই ছিল নিয়ন্ত্রণ। বিদ্যুৎ সংযোগের ক্ষেত্রেও অবৈধ লাইনের অভিযোগ এসেছে, মাসিক চাঁদার অভিযোগ এসেছে, দোকান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ফি আদায়ের অভিযোগ এসেছে। এই অভিযোগগুলো সত্য হলে এটি শুধু একটি অপরাধ চক্র নয়, এটি একটি সমান্তরাল রাজস্ব ব্যবস্থা, যেখানে রাষ্ট্রের করব্যবস্থা নয়, একটি গোষ্ঠীর চাঁদাব্যবস্থাই ছিল কার্যকর।

তবে জঙ্গল ছলিমপুরের বাস্তবতা শুধু অপরাধের কাহিনি নয়, এটি বসবাসকারী মানুষের জটিল গল্পও। অনেকেই এখানে এসেছে স্বল্প খরচে বসতির আশায়। শহরের ভাড়া, জমির দাম, পরিকল্পিত আবাসনের সীমাবদ্ধতার কারণে তারা এই অনিশ্চিত ব্যবস্থার মধ্যেও আশ্রয় খুঁজেছে। কেউ কেউ বলছেন, অন্য কোথাও ঘর তোলার সামর্থ্য ছিল না, তাই তারা বাধ্য হয়েছে। এই বাধ্যতার সুযোগ নিয়েই গড়ে ওঠে দখলদার সিন্ডিকেট। ফলে এখানে একদিকে অপরাধ অর্থনীতি, অন্যদিকে বাস্তুচ্যুত মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই, দুটিই একই জায়গায় জড়ো হয়েছে।

এখানেই প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু অভিযান চালিয়ে অস্থায়ীভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলে, সমস্যার শেকড় থেকে যায়। আবার শুধু উচ্ছেদ করলে তৈরি হয় মানবিক সংকট। তাই স্থানীয়দের মতে, প্রকৃত পরিবর্তন আসবে তখনই, যখন অবৈধ দখল ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভাঙার পাশাপাশি বাস্তবসম্মত পুনর্বাসন, পরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশ রক্ষা এবং আইন প্রয়োগ একসঙ্গে চলবে। নইলে জঙ্গল ছলিমপুর কেবল নাম বদলাবে, কিন্তু কাঠামো বদলাবে না।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, অভিযানের বহুদিন পরও প্রধান আসামি মোহাম্মদ ইয়াছিন অধরা কেন। প্রশাসনের দাবি, তাকে ধরতে চেষ্টা অব্যাহত। স্থানীয়দের দাবি, তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি কাঠামোর প্রতীক। তাই তাকে গ্রেপ্তার করা মানে একটি নেটওয়ার্ককে ভাঙা। আর এই ভাঙার লড়াইয়ে রাষ্ট্র কতটা ধারাবাহিক, সেটাই এখন দেখার বিষয়। কারণ জঙ্গল ছলিমপুরের ভয় কেবল অস্ত্রে নয়, এটি একটি দীর্ঘদিনের “অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ” এর মনস্তত্ত্ব। সেই মনস্তত্ত্ব ভাঙতে হলে, শুধু একদিনের অভিযান নয়, দরকার দীর্ঘদিনের আইনি, প্রশাসনিক এবং সামাজিক পুনর্গঠন।