
সময়ের নিজস্ব এক নির্লিপ্ত গতি আছে—সে কারও জন্য থামে না, কারও বেদনা বোঝে না, কারও শূন্যতাকে পূরণ করে না। তবুও মানুষের হৃদয় সময়কে থামিয়ে রাখতে চায়—বিশেষ করে যখন সেই সময়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকে প্রিয় কোনো মুখের স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া এক সম্পর্কের নিঃশব্দ প্রতিধ্বনি। আজ ঠিক তেমনই একটি দিন। একটি বছর পেরিয়ে গেছে—সাংবাদিক জামাল উদ্দিন আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার পর। অথচ মনে হয়, যেন সেদিনই তার সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল।
জামাল—আমার কাছে সে শুধু একজন সহকর্মী ছিল না, ছিল ছোট ভাইয়ের মতো এক আপন মানুষ। বয়সে ছোট হলেও, হৃদয়ের গভীরতায় সে ছিল পরিপক্ব, আর জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে যে দৃঢ়তায় সে মোকাবিলা করত, তা অনেক বড় মানুষকেও হার মানাত। আজ যখন তার কথা লিখতে বসি, মনে হয়—আমি কোনো মানুষকে স্মরণ করছি না, বরং এক নিঃশব্দ সংগ্রামের ইতিহাস লিখছি।
আমার সঙ্গে তার পরিচয় আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগের। তখন সে সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করেনি। কিন্তু সেই সময়ের পরিচয়ই ধীরে ধীরে রূপ নেয় এক বিশ্বাসের সম্পর্কে, এক আন্তরিকতার বন্ধনে। জীবন তাকে নিয়ে গেছে ভিন্ন পথে, আমাকেও ব্যস্ত করেছে আমার নিজস্ব কর্মক্ষেত্রে, কিন্তু আমাদের সম্পর্কের সুতো কখনো ছিঁড়ে যায়নি।
জামাল যখন ‘চট্টগ্রাম পাতা’ নামে একটি পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করল, আমি তার চোখে দেখেছি স্বপ্ন—একটি নির্ভীক, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বপ্ন। সে জানত পথ কঠিন, জানত প্রতিকূলতা আসবে, তবুও থেমে থাকেনি। আমি তার সেই পথচলায় পাশে দাঁড়িয়েছিলাম—কখনো নীরবে, কখনো কলম হাতে। সেই পত্রিকার পাতায় আমার লেখা ছড়িয়ে ছিল—প্রতিদিনের উপসম্পাদকীয়, টানা দুই বছর। রাষ্ট্র, সমাজ, ইতিহাস, রাজনীতি—সবকিছু নিয়ে আমি লিখেছি, আর সে সেগুলো ধারণ করেছে নিজের শ্রমে, নিজের দায়বদ্ধতায়।
আজ যখন পেছনে তাকাই, বুঝতে পারি—ওটা শুধু একটি পত্রিকা ছিল না, ছিল আমাদের দুজনের স্বপ্নের সম্মিলিত এক নির্মাণ।
কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো—যারা সবচেয়ে বেশি দেয়, তারাই অনেক সময় সবচেয়ে বেশি অবহেলিত হয়। জামালও ছিল তেমনই এক মানুষ। নিজের কষ্ট, নিজের অসুস্থতা, নিজের অভাব—সবকিছু সে লুকিয়ে রাখত। কখনো কাউকে বোঝাতে চাইত না, কখনো নিজের দুর্বলতাকে প্রকাশ করতে চাইত না।
সেই শেষ দেখা—আজও আমার ভেতরে এক অদৃশ্য যন্ত্রণার মতো রয়ে গেছে। কোতোয়ালি থানায়, ওসি (অপারেশন) রুবেল সাহেবের কক্ষে, সে আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। হাতে তার পত্রিকার সম্পাদকীয় কার্ড, মুখে এক ক্লান্তির ছাপ, চোখে এক গভীর নীরবতা।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “জামাল, কেমন আছো?”
সে হয়তো উত্তর দিয়েছিল, কিন্তু সেই উত্তর শব্দে ছিল না ছিল তার চোখের ভেতরে জমে থাকা অবসাদে।
সেদিন আমার মনে হয়েছিল—জামাল ভালো নেই। তার শরীর যেন তাকে ছেড়ে দিচ্ছে, তার মন যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে দীর্ঘ সংগ্রামে। কিন্তু আমি তাকে জোর করে বলতে পারিনি—“চলো, চিকিৎসা করাও।”
এই না বলা কথাটাই আজ আমার সবচেয়ে বড় আক্ষেপ।
এক বছর পর দাঁড়িয়ে মনে হয়—মানুষের জীবনে কিছু ‘যদি’ থেকে যায়, কিছু ‘হয়তো’ থেকে যায়, যেগুলোর কোনো উত্তর কখনো পাওয়া যায় না। জামালের জীবনও তেমনই কিছু অপূর্ণতার গল্প রেখে গেছে।
তার বিদায়ের দিনটি ছিল নিঃশব্দ বেদনার এক অধ্যায়। বাদে জোহর, চট্টগ্রাম বেপারি পাড়া মসজিদের মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছিল তার জানাজা। মানুষের ভিড় ছিল, কিন্তু সেই ভিড়ের ভেতরে ছিল এক অদ্ভুত নীরবতা—যেন সবাই কিছু বলতে চায়, কিন্তু শব্দ খুঁজে পায় না। তারপর তাকে দাফন করা হলো রিয়াজউদ্দিন বাজার সংলগ্ন চতাইন্যা গলি বাইশ মহল্লার কবরস্থানে।
মাটির নিচে শুয়ে পড়ল এক জীবন, এক সংগ্রাম, এক অদম্য ইচ্ছাশক্তি।
জামালের বয়স বেশি ছিল না। আমাদের চেয়ে ছোটই বলা চলে। কিন্তু তার অভিজ্ঞতা, তার লড়াই, তার সহনশীলতা—সবকিছু তাকে অনেক বড় করে তুলেছিল। সে কখনো নিজের অর্জন নিয়ে কথা বলেনি, কখনো নিজেকে সামনে আনেনি। কিন্তু তার কাজই ছিল তার পরিচয়, তার সততাই ছিল তার শক্তি।
আজ তার অনুপস্থিতি শুধু একজন মানুষের অনুপস্থিতি নয়—এটি একটি সময়ের, একটি চেতনার, একটি নির্লোভ জীবনের অনুপস্থিতি। সাংবাদিক সমাজ একজন নিষ্ঠাবান সহযোদ্ধাকে হারিয়েছে, আর আমি হারিয়েছি এমন একজন মানুষকে, যাকে আমি নিঃসন্দেহে বলতে পারতাম—“সে আমার ছোট ভাই।”
এক বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু তার স্মৃতি এখনো তাজা। কিছু মানুষ চলে গেলেও চলে যায় না—তারা থেকে যায় স্মৃতির ভেতরে, অনুভূতির গভীরে, নীরব কোনো শূন্যতার মধ্যে।
জামাল ঠিক তেমনই এক উপস্থিতি—যে অনুপস্থিত হয়েও আমার জীবনের অংশ হয়ে আছে।
আজ তার জন্য শুধু দোয়া করি—
আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন।
তার জীবনের সব কষ্ট, অবহেলা, অপূর্ণতা—সবকিছুর বিনিময়ে তিনি যেন পান এক চিরস্থায়ী শান্তি।
আর আমি—
আমি তাকে মনে রাখবো, যতদিন আমার কলমে শব্দ থাকবে,
যতদিন আমার হৃদয়ে অনুভূতি থাকবে,
যতদিন আমি মানুষ হয়ে বেঁচে থাকবো।

এম কামাল উদ্দিন 






















