১২:২৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬

নীরব চোখে এক অনির্বচনীয় সন্ধ্যা: নাঈমা সুলতানার প্রতিচ্ছবি ও স্মৃতির পুনর্লিখন

কিছু মানুষের নাম উচ্চারণ করলেই যেন ভেতরে ভেতরে এক অদ্ভুত নীরব সুর বাজতে শুরু করে। নাঈমা সুলতানা—তেমনই এক নাম। তাঁর উপস্থিতি কখনো উচ্চকণ্ঠ নয়, বরং গভীর—চোখের ভেতরে লুকানো এক বিস্ময়কর স্থিরতা, যেখানে ভাষাহীন অনুভূতিরা নিজস্ব ছন্দে কথা বলে।
আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে, এমনই এক রাতে লেখা হয়েছিল এই গল্পের শুরু। সময়ের ব্যবধানে সেই স্মৃতি আজ আরও পরিণত, আরও অর্থবহ। কারণ, যাঁকে ঘিরে এই অনুভব, তিনি শুধু একজন মানুষ নন—তিনি দায়িত্ব, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার এক অনন্য মেলবন্ধন। একজন দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে তিনি পিবিআই-তে (Police Bureau of Investigation) গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন, আর বর্তমানে এপিবিএন (Armed Police Battalion)-এ পুলিশ সুপার হিসেবে নিষ্ঠা ও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
সেই রাত—চট্টগ্রামের এক নিভৃত অথচ আলোছায়ায় মোড়া প্রেক্ষাপট। ভিআইপি টাওয়ারের উপরে “সামস” চাইনিজ রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। শহর তখন দিনের ক্লান্তি গুটিয়ে নিচ্ছে, আর রাত ধীরে ধীরে তার রহস্যময় আবরণ মেলে ধরছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই, লিফটের সামনে হঠাৎ দেখা—নাঈমা সুলতানা।
একটি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন—
“ভাই, চিনতে পারছেন না?”
প্রশ্নটি ছিল সহজ, কিন্তু তার ভেতরে ছিল এক অদ্ভুত আন্তরিকতা। চোখে চোখ পড়তেই মনে হলো—এই মুখ তো একদিন গভীর মনোযোগে দেখেছিলাম, অথচ সময়ের ধুলায় ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। নিজের অক্ষমতায় খানিক লজ্জা মিশে গিয়ে বলেছিলাম—
“দুঃখিত, এত ভালো মানুষের মুখ মনে রাখতে না পারাটা আমারই ব্যর্থতা।”
তিনি হাসলেন—একটি শান্ত, সংযত, অথচ আত্মবিশ্বাসে ভরা হাসি। তারপর নিজেই পরিচয় দিলেন—
“আমি নাঈমা সুলতানা, এসপি, পিবিআই।”
এই পরিচয়ের ভেতরে কোনো অহংকার ছিল না, বরং ছিল দায়িত্ববোধের এক নিঃশব্দ দীপ্তি। একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা হয়েও তাঁর কথায়, ভঙ্গিতে, আচরণে ছিল এক ধরনের সহজ মানবিকতা—যা আজকাল খুব সহজে চোখে পড়ে না।
লিফট ধীরে নিচে নামছিল, অথচ সময় যেন থেমে গিয়েছিল কয়েকটি ক্ষণ। কথার ফাঁকে আমি জানালাম—তাঁকে নিয়ে আরও কিছু লিখতে চাই। তিনি নির্ভার কণ্ঠে বললেন—
“ইনশাআল্লাহ, একদিন দেখা হবে।”
এই সংক্ষিপ্ত সংলাপ যেন এক দীর্ঘ গল্পের বীজ বুনে গেল মনে।
হঠাৎই মনে পড়ে গেল আরও পুরোনো এক স্মৃতি—প্রথম সাক্ষাৎ, তাঁর অফিসে। তখন তাঁকে উপহার দিয়েছিলাম আমার দীর্ঘ গবেষণার ফল ‘সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের কথা’। সেটি ছিল নিছক একটি বই নয়, বরং একজন লেখকের পক্ষ থেকে একজন সচেতন পাঠকের প্রতি এক ধরনের নীরব শ্রদ্ধা। তিনি যেভাবে মনোযোগ দিয়ে বইটি গ্রহণ করেছিলেন, সেই দৃষ্টির গভীরতা আজও স্পষ্ট মনে পড়ে।
এই দুই সময়—একটি প্রথম পরিচয়ের, অন্যটি পুনর্মিলনের—মাঝখানে যে অদৃশ্য সেতুটি তৈরি হয়েছে, সেটিই হয়তো এই লেখার প্রাণ।
নাঈমা সুলতানা—একজন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর কঠোরতা যেমন আছে, তেমনি একজন মানুষ হিসেবে তাঁর ভেতরে রয়েছে কোমলতা ও প্রজ্ঞার এক সুন্দর সমন্বয়। দায়িত্বের কঠিন কাঠামোর ভেতর থেকেও তিনি নিজেকে ধরে রেখেছেন সুশৃঙ্খল, সংযত ও মর্যাদাপূর্ণ এক ব্যক্তিত্বে। তাই তাঁকে দেখলে মনে হয়—কিছু মানুষ কেবল পেশায় বড় হন না, তাঁরা মানসিকতা ও মূল্যবোধেও হয়ে ওঠেন অনন্য।
সেই রাতে, কথার এক পর্যায়ে যখন আমি বলেছিলাম—
“আপনাকে নিয়ে একটি উপন্যাস লিখতে চাই,”
তিনি খুব স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিয়েছিলেন—
“লিখেন ভাই।”
এই দুটি শব্দই যেন হয়ে উঠেছিল এক লেখকের জন্য প্রেরণার দরজা। মনে হয়েছিল—অনেকদিন ধরে যে অনুভূতিগুলো শব্দ খুঁজছিল, সেগুলো হঠাৎ করেই একটি দিকনির্দেশনা পেয়ে গেল।
আজ, এক বছর পর দাঁড়িয়ে মনে হয়—সেই রাতটি কোনো সাধারণ রাত ছিল না। সেটি ছিল এক নীরব উপলব্ধির রাত, যেখানে একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব আরেকজন মানুষের কলমকে স্পর্শ করেছিল গভীরভাবে।
কিছু মানুষ কবিতা হয়ে ওঠেন, কিছু মুহূর্ত গল্প। আর কিছু সাক্ষাৎ—যেগুলো কোনো ঘোষণা ছাড়াই জীবনের পাতায় স্থায়ী হয়ে যায়। নাঈমা সুলতানা তেমনই এক চরিত্র—যিনি বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে থেকেও কল্পনার পরিসরে আলো ছড়ান।
এই লেখাটি সেই এক সন্ধ্যার, সেই এক সংক্ষিপ্ত সংলাপের, আর এক অনির্বচনীয় অনুভূতির পুনর্লিখন—যেখানে নীরব চোখে মুখোমুখি হয়ে জন্ম নেয় এক দীর্ঘস্থায়ী সাহিত্যিক প্রতিধ্বনি।
চলবে…

জনপ্রিয়

নীরব চোখে এক অনির্বচনীয় সন্ধ্যা: নাঈমা সুলতানার প্রতিচ্ছবি ও স্মৃতির পুনর্লিখন

নীরব চোখে এক অনির্বচনীয় সন্ধ্যা: নাঈমা সুলতানার প্রতিচ্ছবি ও স্মৃতির পুনর্লিখন

প্রকাশের সময় : ০৬:১৭:২১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬

কিছু মানুষের নাম উচ্চারণ করলেই যেন ভেতরে ভেতরে এক অদ্ভুত নীরব সুর বাজতে শুরু করে। নাঈমা সুলতানা—তেমনই এক নাম। তাঁর উপস্থিতি কখনো উচ্চকণ্ঠ নয়, বরং গভীর—চোখের ভেতরে লুকানো এক বিস্ময়কর স্থিরতা, যেখানে ভাষাহীন অনুভূতিরা নিজস্ব ছন্দে কথা বলে।
আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে, এমনই এক রাতে লেখা হয়েছিল এই গল্পের শুরু। সময়ের ব্যবধানে সেই স্মৃতি আজ আরও পরিণত, আরও অর্থবহ। কারণ, যাঁকে ঘিরে এই অনুভব, তিনি শুধু একজন মানুষ নন—তিনি দায়িত্ব, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার এক অনন্য মেলবন্ধন। একজন দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে তিনি পিবিআই-তে (Police Bureau of Investigation) গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন, আর বর্তমানে এপিবিএন (Armed Police Battalion)-এ পুলিশ সুপার হিসেবে নিষ্ঠা ও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
সেই রাত—চট্টগ্রামের এক নিভৃত অথচ আলোছায়ায় মোড়া প্রেক্ষাপট। ভিআইপি টাওয়ারের উপরে “সামস” চাইনিজ রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। শহর তখন দিনের ক্লান্তি গুটিয়ে নিচ্ছে, আর রাত ধীরে ধীরে তার রহস্যময় আবরণ মেলে ধরছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই, লিফটের সামনে হঠাৎ দেখা—নাঈমা সুলতানা।
একটি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন—
“ভাই, চিনতে পারছেন না?”
প্রশ্নটি ছিল সহজ, কিন্তু তার ভেতরে ছিল এক অদ্ভুত আন্তরিকতা। চোখে চোখ পড়তেই মনে হলো—এই মুখ তো একদিন গভীর মনোযোগে দেখেছিলাম, অথচ সময়ের ধুলায় ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। নিজের অক্ষমতায় খানিক লজ্জা মিশে গিয়ে বলেছিলাম—
“দুঃখিত, এত ভালো মানুষের মুখ মনে রাখতে না পারাটা আমারই ব্যর্থতা।”
তিনি হাসলেন—একটি শান্ত, সংযত, অথচ আত্মবিশ্বাসে ভরা হাসি। তারপর নিজেই পরিচয় দিলেন—
“আমি নাঈমা সুলতানা, এসপি, পিবিআই।”
এই পরিচয়ের ভেতরে কোনো অহংকার ছিল না, বরং ছিল দায়িত্ববোধের এক নিঃশব্দ দীপ্তি। একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা হয়েও তাঁর কথায়, ভঙ্গিতে, আচরণে ছিল এক ধরনের সহজ মানবিকতা—যা আজকাল খুব সহজে চোখে পড়ে না।
লিফট ধীরে নিচে নামছিল, অথচ সময় যেন থেমে গিয়েছিল কয়েকটি ক্ষণ। কথার ফাঁকে আমি জানালাম—তাঁকে নিয়ে আরও কিছু লিখতে চাই। তিনি নির্ভার কণ্ঠে বললেন—
“ইনশাআল্লাহ, একদিন দেখা হবে।”
এই সংক্ষিপ্ত সংলাপ যেন এক দীর্ঘ গল্পের বীজ বুনে গেল মনে।
হঠাৎই মনে পড়ে গেল আরও পুরোনো এক স্মৃতি—প্রথম সাক্ষাৎ, তাঁর অফিসে। তখন তাঁকে উপহার দিয়েছিলাম আমার দীর্ঘ গবেষণার ফল ‘সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের কথা’। সেটি ছিল নিছক একটি বই নয়, বরং একজন লেখকের পক্ষ থেকে একজন সচেতন পাঠকের প্রতি এক ধরনের নীরব শ্রদ্ধা। তিনি যেভাবে মনোযোগ দিয়ে বইটি গ্রহণ করেছিলেন, সেই দৃষ্টির গভীরতা আজও স্পষ্ট মনে পড়ে।
এই দুই সময়—একটি প্রথম পরিচয়ের, অন্যটি পুনর্মিলনের—মাঝখানে যে অদৃশ্য সেতুটি তৈরি হয়েছে, সেটিই হয়তো এই লেখার প্রাণ।
নাঈমা সুলতানা—একজন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর কঠোরতা যেমন আছে, তেমনি একজন মানুষ হিসেবে তাঁর ভেতরে রয়েছে কোমলতা ও প্রজ্ঞার এক সুন্দর সমন্বয়। দায়িত্বের কঠিন কাঠামোর ভেতর থেকেও তিনি নিজেকে ধরে রেখেছেন সুশৃঙ্খল, সংযত ও মর্যাদাপূর্ণ এক ব্যক্তিত্বে। তাই তাঁকে দেখলে মনে হয়—কিছু মানুষ কেবল পেশায় বড় হন না, তাঁরা মানসিকতা ও মূল্যবোধেও হয়ে ওঠেন অনন্য।
সেই রাতে, কথার এক পর্যায়ে যখন আমি বলেছিলাম—
“আপনাকে নিয়ে একটি উপন্যাস লিখতে চাই,”
তিনি খুব স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিয়েছিলেন—
“লিখেন ভাই।”
এই দুটি শব্দই যেন হয়ে উঠেছিল এক লেখকের জন্য প্রেরণার দরজা। মনে হয়েছিল—অনেকদিন ধরে যে অনুভূতিগুলো শব্দ খুঁজছিল, সেগুলো হঠাৎ করেই একটি দিকনির্দেশনা পেয়ে গেল।
আজ, এক বছর পর দাঁড়িয়ে মনে হয়—সেই রাতটি কোনো সাধারণ রাত ছিল না। সেটি ছিল এক নীরব উপলব্ধির রাত, যেখানে একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব আরেকজন মানুষের কলমকে স্পর্শ করেছিল গভীরভাবে।
কিছু মানুষ কবিতা হয়ে ওঠেন, কিছু মুহূর্ত গল্প। আর কিছু সাক্ষাৎ—যেগুলো কোনো ঘোষণা ছাড়াই জীবনের পাতায় স্থায়ী হয়ে যায়। নাঈমা সুলতানা তেমনই এক চরিত্র—যিনি বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে থেকেও কল্পনার পরিসরে আলো ছড়ান।
এই লেখাটি সেই এক সন্ধ্যার, সেই এক সংক্ষিপ্ত সংলাপের, আর এক অনির্বচনীয় অনুভূতির পুনর্লিখন—যেখানে নীরব চোখে মুখোমুখি হয়ে জন্ম নেয় এক দীর্ঘস্থায়ী সাহিত্যিক প্রতিধ্বনি।
চলবে…