
আন্তর্জাতিক ডেক্স:
ইরানে টানা দুই সপ্তাহ ধরে চলমান বিক্ষোভ গত বুধবার থেকে তীব্র ও সহিংস রূপ নিয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় ও রাজনৈতিক অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন সরাসরি সরকার পতনের দাবিতে রূপ নিয়েছে। বিক্ষোভকারীদের স্লোগানে উঠে এসেছে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পদত্যাগের দাবি। বিভিন্ন শহরে শোনা যাচ্ছে, ‘স্বৈরশাসকের মৃত্যু হোক’—এমন স্লোগান।
রাজধানী তেহরান ছাড়াও কোম, ইসফাহান, বান্দার আব্বাস, মাশহাদ, ফারদিস ও বোজনুর্দসহ দেশের অন্তত ৩১টি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে এই বিক্ষোভ। বিক্ষোভকারীরা সরকারি ভবন, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেলসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করেছে। কোথাও কোথাও নিজ দেশের জাতীয় পতাকা ছিঁড়ে ফেলতেও দেখা গেছে তাদের।
এমন পরিস্থিতিতে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যারা দেশে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে সরকার আর কোনো ছাড় দেবে না। এরপরই দেশটির এলিট বাহিনী ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানায়, দেশের চলমান অস্থিরতা আর অব্যাহত থাকতে দেওয়া হবে না।
বিবৃতির পর থেকেই বৃহস্পতিবার রাত থেকে কঠোর অভিযান শুরু করে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড। সহিংস বিক্ষোভকারীদের ওপর ব্যাপক গুলি চালানো হয়। এতে শুধু রাজধানী তেহরানেই এক রাতে ২০০ জনের বেশি বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সাময়িকী টাইম ম্যাগাজিন।
শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে টাইম ম্যাগাজিন জানায়, নাম প্রকাশ না করার শর্তে তেহরানের এক চিকিৎসক তাদের জানিয়েছেন—শুধু তেহরানের ছয়টি হাসপাতালে অন্তত ২০৬ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগই গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন বলে ওই চিকিৎসক দাবি করেছেন।
ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, উত্তর তেহরানের একটি পুলিশ স্টেশনের বাইরে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে মেশিনগান থেকে ব্রাশফায়ার করা হয়েছে। এতে অন্তত ৩০ জন গুলিবিদ্ধ হন। নিহতদের বেশিরভাগই তরুণ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক। তবে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে টাইম ম্যাগাজিন।
টাইম ম্যাগাজিনের মতে, এই প্রাণঘাতী অভিযানের মাধ্যমে ইরান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুঁশিয়ারিকেও উপেক্ষা করেছে। ট্রাম্প আগে সতর্ক করে বলেছিলেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে খামেনি সরকারকে ‘চড়া মূল্য’ দিতে হবে।
বিক্ষোভ আরও ছড়িয়ে পড়ায় শুক্রবার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে কঠোর ভাষায় বক্তব্য দেন। তিনি বলেন,
‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র শত শত হাজার সম্মানিত মানুষের রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যারা এটিকে ধ্বংস করতে চায়, এমন শক্তির সামনে ইরান কখনোই মাথা নত করবে না।’
তিনি বিক্ষোভকারীদের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুশি করার অভিযোগও তোলেন।
এদিকে তেহরানের পাবলিক প্রসিকিউট ঘোষণা দিয়েছেন, যারা নাশকতা চালাবে কিংবা নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াবে, তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি—মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও নতুন করে ইরান সরকারকে সতর্ক করে বলেন,
‘তোমরা গুলি চালানো শুরু করো না। কারণ তাহলে আমরাও গুলি চালানো শুরু করব। আমি শুধু আশা করি, ইরানের বিক্ষোভকারীরা নিরাপদ থাকবে—কারণ এই মুহূর্তে পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক।’
চলমান এই সহিংসতা ও কঠোর দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে ইরান গভীর রাজনৈতিক ও মানবিক সংকটের দিকে এগোচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
























