সম্প্রতি আরোপিত মার্কিন ‘ভিসা বন্ড’ ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাতায়াত সহজ করার অনুরোধ জানিয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান। বিশেষ করে বি-১ (স্বল্পমেয়াদি ব্যবসা) ভিসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের এই বন্ড থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শুক্রবার ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের রাজনৈতিক বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি অ্যালিসন হুকারের সঙ্গে এক বৈঠকে এ অনুরোধ জানান ড. খলিলুর রহমান। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
বৈঠকে ড. খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক সম্প্রসারণে ব্যবসায়ীদের নিয়মিত যাতায়াত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে ভিসা বন্ডের শর্ত শিথিল করা হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার হবে।
জবাবে আন্ডার সেক্রেটারি অ্যালিসন হুকার বিষয়টি আমলে নেওয়ার কথা জানিয়ে বলেন, মার্কিন সরকার এই অনুরোধ ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে। তিনি ইঙ্গিত দেন, ভবিষ্যতে যদি পর্যটক ও ভিসাধারীদের নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত অবস্থানের হার (ওভারস্টে) উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে, তাহলে এই বন্ড ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।
এ সময় নথিপত্রহীন বাংলাদেশিদের স্বদেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ঢাকার আন্তরিক সহযোগিতার ভূয়সী প্রশংসা করেন হুকার।
বৈঠকে বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন, দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক, রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ড. খলিলুর রহমান হুকারকে নির্বাচনের প্রস্তুতি ও আয়োজন সম্পর্কে অবহিত করেন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে নির্বাচনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।
আন্ডার সেক্রেটারি হুকার বলেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে যুক্তরাষ্ট্রের জোরালো সমর্থন অব্যাহত থাকবে। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র আগামী ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রত্যাশা করে।
ড. খলিলুর রহমান যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য আমদানি বাড়ার ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য অব্যাহত সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ধন্যবাদ জানান। তিনি উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় দাতা দেশ এবং এই সহায়তা অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানান।
হুকার বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে বড় দায়িত্ব বহন করছে, তার জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি এই সংকটের সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়ভার ভাগ করে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন এবং বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জীবনমান উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশন (ডিএফসি) অর্থায়নে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের প্রবেশাধিকার এবং দেশের সেমিকন্ডাক্টর উন্নয়নে বিশেষ আর্থিক সহায়তার অনুরোধও জানান। এ বিষয়ে হুকার প্রস্তাবগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দেন।
এছাড়া গাজায় মোতায়েন হতে যাওয়া সম্ভাব্য ‘আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা বাহিনী’-তে অংশগ্রহণের বিষয়ে বাংলাদেশের নীতিগত আগ্রহের কথাও তুলে ধরেন ড. খলিলুর রহমান। জবাবে হুকার জানান, গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।
ওয়াশিংটন সফরের অংশ হিসেবে ড. খলিলুর রহমান পৃথকভাবে মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে আসন্ন নির্বাচন, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, রোহিঙ্গা সংকট, ভিসা বন্ড, বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
এদিকে বাংলাদেশে নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের শপথ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগ দেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনা ও সম্পদবিষয়ক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল জে রিগাস।
অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, দূতাবাসের কর্মকর্তা, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং শীর্ষ ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের উজ্জ্বল গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের পথে সহায়তা অব্যাহত রাখবে। নির্বাচনের ফলাফলের অপেক্ষায় আছি এবং নবনির্বাচিত সরকারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে কাজ করতে চাই।”
সব অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন।
























